আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইতালির রাজধানী রোমের পশ্চিমাঞ্চলের কাসালোত্তি এলাকায় এক বাংলাদেশি পরিবারের তিন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তদন্তে একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে বাংলাদেশি নাগরিক শাহাদাত হোসেন (৪৩)-এর ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করেছে ইতালির রাষ্ট্রীয় পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারে রোম, ফ্রোসিনোনে, পুরো লাৎসিও অঞ্চল এবং সম্ভাব্য যোগাযোগের সূত্র ধরে যুক্তরাজ্যেও অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।
শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে রোমের ভিয়া মন্তিলিও সড়কের একটি অ্যাপার্টমেন্টে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিহতরা হলেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তার স্ত্রী হোসনে জাহান মমতাজ (৩৮) এবং তাদের কন্যা আরোয়া ইসলাম আরিশা। একই হামলায় গুরুতর আহত হন পরিবারের বড় ছেলে আমির হোসেন অয়ন (২০)। তিনি বর্তমানে রোমের জেমেল্লি পলিক্লিনিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং চিকিৎসকদের মতে তিনি প্রাণসংকটমুক্ত।
তদন্তকারীদের ধারণা, হত্যাকাণ্ডের সময় শাহাদাত হোসেন প্রথমে বাসার ভেতরে থাকা মা ও শিশুকন্যাকে ধারালো একটি ম্যাশেটি (বড় দা) দিয়ে হত্যা করেন। এরপর তিনি বাসার ভেতরের রক্তের দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা করেন।
রাত প্রায় ১০টার দিকে কামাল উদ্দিন তার ছেলে আমির হোসেন অয়নকে নিয়ে বাসায় ফিরলে দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকা হামলাকারী তাদের ওপরও হামলা চালায়। এতে কামাল উদ্দিন নিহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় অয়ন কোনোভাবে বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় এসে সাহায্য চাইলে প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।
তদন্তে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ২৪ ঘণ্টা আগে শাহাদাত হোসেন নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি রহস্যময় বার্তা পোস্ট করেছিলেন।
সেখানে তিনি লিখেছিলেন:
“একজন মানুষ একা মারা যায় না।”
এছাড়া তিনি আরও লিখেছিলেন:
“তুমি যখন মারা যাবে, তখন তোমার প্রিয়জনদেরও তোমার সঙ্গে মারা উচিত। তাহলে আর কাউকে কারও জন্য কষ্ট পেতে হবে না।”
হত্যাকাণ্ডের পর ওই পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং অসংখ্য মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রোম পুলিশের স্কোয়াড্রা মোবাইলের তদন্তকারীরা মনে করছেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা একতরফা আসক্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইতালীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দাবি, অতীতে শাহাদাত হোসেন নিহত গৃহবধূকে বিরক্ত বা হয়রানি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তদন্ত এখনও চলমান এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, শাহাদাত হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছিলেন। তিনি এক বছর আগে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার (আশ্রয়) আবেদন করেছিলেন। তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের দিনই ফ্রোসিনোনে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তিনি রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি এবং আবাসিক অনুমতি পান।
বর্তমানে তাকে ধরতে ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যেও সম্ভাব্য যোগাযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধান চলছে। একই সঙ্গে তদন্তকারীরা আত্মহত্যার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তাদের ধারণা, পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন, যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি।
ঘটনাস্থল থেকে একটি বড় ধারালো ম্যাশেটি উদ্ধার করেছে পুলিশ, যা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ঘটনাস্থলের অদূরে একটি রক্তমাখা সোয়েটশার্ট ও একটি নীল রঙের টি-শার্ট উদ্ধার করা হয়েছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা এসব আলামত পরীক্ষা করছেন।
এই মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষ জীবিত সাক্ষী আমির হোসেন অয়ন। পেটে গভীর আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রাণ বাঁচাতে রাস্তায় বের হয়ে সাহায্য চান। তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে তদন্তকারীরা তার কাছ থেকে বিস্তারিত জবানবন্দি নেবেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘটনার রাতে বাসা থেকে চিৎকার শুনে তারা বাইরে বেরিয়ে আসেন। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী রক্তমাখা পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে হেঁটে ঘটনাস্থল ছেড়ে যেতে দেখেছেন বলে পুলিশকে জানিয়েছেন।
এদিকে নিহত পরিবারের বাসার সামনে ফুল রেখে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রোমের প্রসিকিউটর অফিসের তত্ত্বাবধানে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে। নিহত তিনজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম এবং সন্দেহভাজনের অতীত কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখছেন।
পুলিশ সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, কেউ যদি শাহাদাত হোসেনের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানেন, তাহলে যেন দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে তাকে নিজেরা আটক বা তার মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা না করার জন্যও সতর্ক করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, শাহাদাত হোসেন বর্তমানে এই মামলার প্রধান সন্দেহভাজন। আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।



