এনআরবি নিউজ ইউরোপ ডেস্ক
মরক্কো সীমান্তবর্তী স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সিউতায় নজিরবিহীন অভিবাসী সংকটের মধ্যে পরিস্থিতি পরিদর্শনে শুক্রবার (৩১ জুলাই) শহরটি সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। সেখানে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাটি “স্পেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন” এবং এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে সরকারের সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দেন।
সিউটার প্রশাসনিক ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সানচেজ বলেন, “সিউটার জনগণ একা নয়। পুরো স্পেন তাদের পাশে রয়েছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করব। এটি শুধু সীমান্ত লঙ্ঘনের ঘটনা নয়, মানবপাচারকারী চক্র সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়কে অপব্যাখ্যা করে হাজারো মানুষকে বিপজ্জনকভাবে সমুদ্রপথে যাত্রায় উৎসাহিত করেছে।”
তিনি জানান, সিউটা-মরক্কো সীমান্তে সমুদ্রপথে অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে তারাহাল উপকূলে ভাসমান বয়া স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারী অভিবাসীদের আইন অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব মরক্কোতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সীমান্তে অতিরিক্ত ৪০০ জন পুলিশ ও সিভিল গার্ড মোতায়েনের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও নিরাপত্তা জোরদারে কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরে স্পেনে অনিয়মিত অভিবাসীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৩৭ শতাংশ কমেছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় প্রকাশের পর কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। তার দাবি, ইতোমধ্যে অনেক অভিবাসী মরক্কোতে ফিরে যেতে শুরু করেছে এবং মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে স্পেন ও মরক্কো যৌথভাবে কাজ করছে।
এদিকে সিউটার প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস বলেছেন, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে সিউটায় প্রবেশ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব।” তবে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্য একটি প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৪৯ হাজার মানুষের প্রবেশের তথ্য উঠে এসেছে। সরকার এখনো চূড়ান্ত সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
শুক্রবার ভোরেও মরক্কোর কাস্তিয়েখোস সীমান্ত এলাকায় শত শত মানুষ সিউটায় প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একই ধরনের উত্তেজনা দেখা যায় মেলিয়া সীমান্তেও। মরক্কো সীমান্তে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করলেও সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় এখনো হাজারো মানুষ অবস্থান করছে এবং সুযোগ পেলেই সমুদ্রপথে বা সীমান্ত বেড়া অতিক্রম করে সিউতায় প্রবেশের চেষ্টা করছে।

নিরাপত্তাজনিত কারণে সিউটার অধিকাংশ দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বার ও কিয়স্ক শুক্রবার বন্ধ রাখা হয়। শহরের নির্ধারিত বার্ষিক উৎসবও বাতিল করা হয়েছে।
সিউটার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন ঘটনাকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করেছেন। ফ্রান্স স্পেন সীমান্তে অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করেছে। সুইডেন ও ফিনল্যান্ড পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, আর চীন অবৈধ অভিবাসনের বিরোধিতা করে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে।

অন্যদিকে বিরোধী দল পিপি-এর নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইহো সরকারের প্রতিক্রিয়াকে দুর্বল বলে সমালোচনা করেছেন এবং সীমান্তে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সময়ে স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফেলিপে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও সিউটার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে পরিস্থিতির খোঁজ নেন।
স্পেন সরকার জানিয়েছে, সীমান্তে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সিভিল গার্ডের যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মরক্কোর সঙ্গে সমন্বয় করে অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর কার্যক্রমও চলছে। তবে সীমান্তের ওপারে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ অবস্থান করায় পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি এবং সিউতায় সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে।



