এনআরবি নিউজ ইউরোপ ডেস্ক
মরক্কো সীমান্তবর্তী স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সিউতা (Ceuta) আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সাম্প্রতিক অভিবাসী সংকটের কারণে শহরটিতে মানবিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে—আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত একটি শহর কীভাবে স্পেনের অংশ হলো? কেনই বা মরক্কো দীর্ঘদিন ধরে এই ভূখণ্ডের দাবি করে আসছে?
৩০ জুলাই ভোরে মরক্কো থেকে শত শত অভিবাসী সিউতার সীমান্ত বেড়া অতিক্রম করে স্পেনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। একই সময়ে অনেকেই সাঁতরে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে শহরে পৌঁছান। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পুরো সপ্তাহজুড়ে প্রায় ২ হাজার অভিবাসী মরক্কো থেকে সাঁতরে সিউটায় প্রবেশ করেছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ জন করে মানুষ শহরটিতে পৌঁছেছেন। মাত্র ১০ দিনের মধ্যে শহরের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ শতাংশের সমান মানুষ সিউটায় প্রবেশ করায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পূর্ণ হয়ে যায় এবং শত শত মানুষকে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়।
সিউতার প্রেসিডেন্ট হুয়ান জেসুস ভিভাস পরিস্থিতিকে “সম্পূর্ণ মানবিক ও সামাজিক জরুরি অবস্থা” হিসেবে উল্লেখ করে স্পেন সরকারকে জাতীয় নিরাপত্তা জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং সেনা মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছেন। এ দাবির প্রতি সিউতার আইনসভায় প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল সমর্থন জানিয়েছে।
আদালত রায় দেন, সমুদ্রপথে সাঁতরে সিউতায় পৌঁছানো অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে যারা স্থলসীমান্তের বেড়া টপকে প্রবেশের চেষ্টা করেন, তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা বহাল থাকবে। এই রায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পর বিপুলসংখ্যক মানুষ সাঁতরে সিউতায় যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন।
একই সময়ে সমুদ্রে ডুবে অন্তত ৬০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে মরক্কো সরকার সীমান্ত পারাপারে সহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, মানবপাচারকারী চক্রই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

কোথায় অবস্থিত সিউতা?
সিউটা উত্তর আফ্রিকার উপকূলে, জিব্রাল্টার প্রণালীর মুখে অবস্থিত স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমে সমুদ্রবেষ্টিত এই শহরের দক্ষিণে মরক্কোর ম’দিক-ফনিদেক (M’diq-Fnideq) অঞ্চলের সঙ্গে ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার স্থলসীমান্ত রয়েছে। স্পেনের মূল ভূখণ্ডের কাদিজ প্রদেশ থেকে সিউতার দূরত্ব মাত্র ১৭ কিলোমিটার। শহরটির আয়তন ১৮ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ৮৩ হাজার ৫০০। সিউতা ও মেলিয়া—এই দুটি শহরই আফ্রিকা মহাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত।
কেন আফ্রিকায় থেকেও এটি স্পেনের অংশ?
সিউতার ইতিহাস প্রায় ছয় শতাব্দী পুরোনো। ১৪১৫ সালে পর্তুগাল শহরটি দখল করে। পরে ১৫৮০ সালে পর্তুগাল ও স্পেন একই রাজমুকুটের অধীনে চলে গেলে সিউতায় স্প্যানিশদের বসতি বাড়তে থাকে। ১৬৪০ সালে পর্তুগাল স্বাধীনতা ফিরে পেলেও সিউতার বাসিন্দারা স্পেনের অধীনেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ১৬৬৮ সালের লিসবন চুক্তির মাধ্যমে পর্তুগাল আনুষ্ঠানিকভাবে সিউটার ওপর স্পেনের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে। এরপর থেকে টানা তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সিউতা স্পেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মরক্কো কেন সিউতার দাবি করে?
১৯৫৬ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই মরক্কো সিউতা ও মেলিয়াকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে আসছে। তাদের দাবি, শহর দুটি উত্তর আফ্রিকার অংশ হওয়ায় এগুলোর ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্ব থাকা উচিত। অন্যদিকে স্পেনের যুক্তি হলো, মরক্কো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বহু আগেই সিউটা স্পেনের অধীনে আসে এবং এটি বর্তমানে স্পেনের সংবিধান অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত শহর।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের International and Comparative Law Quarterly-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মরক্কোর আইনি দাবি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এছাড়া জাতিসংঘও কখনো সিউটাকে উপনিবেশমুক্তির অপেক্ষায় থাকা ভূখণ্ডের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেনি।
বিশ্বের অন্যতম সুরক্ষিত সীমান্ত
সিউতা-মরক্কো সীমান্ত বিশ্বের সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত সীমান্তগুলোর একটি।
এখানে রয়েছে—
- প্রায় ৬ মিটার উঁচু দ্বৈত নিরাপত্তা বেড়া (কিছু অংশে ১০ মিটার পর্যন্ত)
- কাঁটাতারের বাধা
- মোশন সেন্সর
- উচ্চক্ষমতার নজরদারি ক্যামেরা
- নিয়মিত পুলিশ ও সিভিল গার্ড টহল
- সমুদ্রপথে নজরদারির জন্য বিশেষ টহল নৌযান
প্রথম সীমান্ত বেড়া নির্মাণ করা হয় ১৯৯৩ সালে। পরে ধাপে ধাপে এর উচ্চতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়। নির্মাণ ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ বহন করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
কেন বারবার অভিবাসীরা সিউতাকে বেছে নেন?
সিউতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রবেশদ্বার হওয়ায় আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের হাজারো অভিবাসীর কাছে এটি ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান রুট। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সিউটায় অনিয়মিত অভিবাসীর সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সংকট, আদালতের রায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনেক সময় সীমান্তে হঠাৎ করে অভিবাসীর ঢল নামার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সংকটও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ, যা ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং স্পেন-মরক্কো কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।



