স্পেনে আসার পর অনেক বছর ধরেই একটা ইচ্ছে ছিল একদিন কর্ডোভা যাব। ছোটবেলা থেকে বাংলাদেশে থাকতে কর্ডোভার মসজিদের কথা শুনেছি, বইয়ের পাতায় পড়েছি, ছবিতে দেখেছি। মানুষের মুখে এর ইতিহাস, সৌন্দর্য আর আন্দালুসিয়ার মুসলিম সভ্যতার গল্প শুনেছি। অনেকবার কর্ডোভা যাওয়ার পরিকল্পনাও করেছি। কিন্তু কোনো না কোনো কারণে শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কখনো ভাবিনি, এতদিনের সেই ইচ্ছেটা একদিন এভাবে হঠাৎ করেই পূরণ হয়ে যাবে।
গতরাতে অপু ভাই ফোন দিয়ে বললেন, “শুভ আসতেছে, সকালে রেডি থাকিও। “তুমি আর শুভ প্ল্যান করো, কোথায় যাওয়া যায়।” আপনারা যারা আমার ভ্রমণ নিয়ে লেখা পড়েছেন, তারা জানেন অপু ভাই বললে আমি সহজে না করতে পারি না, আসলে না করা হয়ও না।
এরপর শুভ ভাই বলল,
“কর্ডোভা যাই।” আমি এক পায়ে রাজি। এতদিনের ইচ্ছে যখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন আর দ্বিতীয়বার ভাবার কী আছে!

যেমন কথা, তেমন কাজ। পরদিন সকালেই গাড়ি নিয়ে ল্যাভাপিয়েসে হাজির। নাস্তা করেই রওনা দিলাম কর্ডোভার উদ্দেশ্যে। সামনে প্রায় ৩৯৬ কিলোমিটারের পথ। দীর্ঘ ড্রাইভ, রাস্তার দৃশ্য, গল্প, হাসি আর আড্ডার মধ্য দিয়ে কখন যে এতটা পথ পেরিয়ে গেলাম, পৌঁছে গেলাম বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত শহর কর্ডোভা।
হোটেলে উঠলাম। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ছিল, তাই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। কিন্তু মনের ভেতর তখন অন্যরকম একটা উত্তেজনা কাজ করছে। কারণ, যে জায়গার কথা এত বছর ধরে শুনেছি, যে জায়গার ছবি বইয়ের পাতায় দেখেছি, আজ সেই জায়গা নিজের চোখে দেখতে যাচ্ছি! একটু বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম কর্ডোভা মসজিদ দেখতে। গন্তব্যের দিকে এগোতে এগোতে মনে হচ্ছিল, এটা শুধু একটা ভ্রমণ নয় এটা যেন বহু বছর ধরে মনের মধ্যে লালন করে আসা একটা স্বপ্নের কাছে পৌঁছে যাওয়া।
বাংলাদেশে থাকতে অনেকবার কর্ডোভার মসজিদের কথা শুনেছি। বইয়ের পাতায় পড়েছি, ছবিতে দেখেছি। কিন্তু কখনো ভাবিনি, একদিন সত্যিই সেই ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে দেখতে পারব, ভেতরে ঢুকে ছবি তুলতে পারব। অবশেষে সেই মুহূর্তটা সত্যি হলো। ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল ইতিহাস যেন বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
ভেতরে ঢোকার পর সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি এর স্থাপত্য দেখে। সারি সারি স্তম্ভ, লাল-সাদা খিলান, বিশাল প্রাঙ্গণ সবকিছু এত সুন্দর, এত নিখুঁত যে বারবার মনে হচ্ছিল, এত শত বছর আগে মানুষ কীভাবে এমন অসাধারণ স্থাপত্য তৈরি করেছিল! বইয়ে পড়েছিলাম, কর্ডোভা একসময় মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। শুধু মসজিদ নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন, সাহিত্য ও স্থাপত্য সব ক্ষেত্রেই কর্ডোভা ছিল তার সময়ের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী। কর্ডোভার এই ঐতিহাসিক মসজিদের নির্মাণ শুরু হয় অষ্টম শতাব্দীতে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শাসকের আমলে এর পরিধি ও সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পায়। শত শত বছর ধরে এটি ছিল মুসলমানদের ইবাদত ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

পরবর্তীতে ১২৩৬ সালে খ্রিস্টীয় রাজাদের হাতে কর্ডোভা পুনর্দখলের পর মসজিদটি ক্যাথলিক গির্জায় রূপান্তরিত হয়। আজও এই স্থাপনাটি তার দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সেখানে দাঁড়িয়ে আমার কাছে সবচেয়ে আবেগের বিষয় ছিল অন্য কিছু। আমি শুধু স্থাপত্য দেখছিলাম না; বারবার মনে হচ্ছিল একসময় এই জায়গাতেই হাজার হাজার মুসলমান নামাজ আদায় করেছেন, কোরআন তিলাওয়াত করেছেন, জ্ঞানচর্চা করেছেন। কত মানুষ এই মেঝেতে সিজদা করেছেন, কত প্রজন্ম এই স্থাপনার ছায়ায় বেড়ে উঠেছে ভাবতেই কেমন যেন একটা অনুভূতি হচ্ছিল।
আজ সময় বদলে গেছে। ইতিহাসের অনেক অধ্যায়ও বদলে গেছে। কিন্তু স্থাপনাটির দেয়াল, স্তম্ভ আর খিলানগুলো যেন সেই অতীতের গল্প এখনো নীরবে বলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে বসে মানুষের মুখে এবং বইয়ের পাতায় কর্ডোভার মসজিদের সৌন্দর্যের কথা যতটা শুনেছিলাম, বাস্তবে এসে মনে হলো সেটাও যেন কম বলা হয়েছিল। নিজ চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাসই করতাম না যে এত শত বছর আগে এমন সুন্দর ও নিখুঁত স্থাপত্য নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। ছবি তুলছিলাম, চারপাশ দেখছিলাম, আর মনে মনে শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম—

“ইতিহাসের বইয়ে পড়া একটি জায়গায় আজ আমি নিজেই দাঁড়িয়ে আছি!” সত্যি বলতে, কিছু ভ্রমণ শুধু ঘুরে বেড়ানোর জন্য হয় না। কিছু ভ্রমণ মানুষের ভেতরে অন্যরকম একটা অনুভূতি তৈরি করে। কর্ডোভা আমার জন্য তেমনই একটি ভ্রমণ। কর্ডোভা শুধু একটি শহর নয়; এটি ইতিহাস, সভ্যতা, জ্ঞান ও স্থাপত্যের এক জীবন্ত অধ্যায়। মুসলিম শাসনামলে আন্দালুসিয়া যে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির অসাধারণ বিকাশ দেখেছিল, কর্ডোভা তার অন্যতম বড় সাক্ষী। আর আমার কাছে এই ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো যে স্বপ্নটা বহু বছর ধরে শুধু পরিকল্পনাতেই ছিল, সেটাই এক সকালে প্রিয় মানুষের সঙ্গে হঠাৎ করেই বাস্তব হয়ে গেল।
অপু ভাইয়ের একটা ফোনকল, শুভ ভাইয়ের একটা প্রস্তাব আর তারপর ৩৯৬ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিয়ে আমরা এসে দাঁড়ালাম ইতিহাসের শহর কর্ডোভায়। জীবনে কিছু জায়গা থাকে, যেখানে যাওয়ার ইচ্ছে অনেকদিনের। কিন্তু যেদিন সত্যিই সেখানে পৌঁছানো যায়, সেদিন বোঝা যায় অপেক্ষাটা বৃথা ছিল না। সুযোগ থাকলে জীবনে অন্তত একবার কর্ডোভা ঘুরে আসা উচিত। শুধু একজন পর্যটক হিসেবে নয় ইতিহাসকে কাছ থেকে দেখতে, সভ্যতাকে অনুভব করতে, আর নিজের চোখে সেই স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে। কারণ কিছু জায়গা শুধু দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়।
কর্ডোভা আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি জায়গা।
লেখক: হোসাইন ইকবাল
ভ্রমণকাহিনি | কর্ডোভা, স্পেন



